আংশিকভাবে এই দাবির সত্যতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে সরকার রাজস্ব আদায় এবং দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে শুল্ক ব্যবহার করেছে। বর্তমানে যে মুক্তবাণিজ্যের ধারণা প্রচলিত, সেটি দেশের পুরো ইতিহাসের তুলনায় অপেক্ষাকৃত নতুন।
তবে ট্রাম্পের ব্যাখ্যা ইতিহাসের সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না। অতীতের বিভিন্ন সময়ে শুল্ক আরোপের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন ভিন্ন। কোথাও সরকারের আয় বাড়ানো ছিল প্রধান লক্ষ্য, কোথাও শিল্পকে বিদেশি প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করা, আবার কোথাও অন্য দেশকে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে রাজি করানো। ট্রাম্প এসব ভিন্ন উদ্দেশ্যকে একসঙ্গে বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন, যা বাস্তবে পরস্পরবিরোধী।
অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ ডগলাস আরউইনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল—রাজস্ব সংগ্রহ, দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত করা। কিন্তু ইতিহাসে এই তিনটি লক্ষ্য কখনোই একই সময়ে সমান গুরুত্ব পায়নি।
স্বাধীনতার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম অর্থমন্ত্রী আলেকজান্ডার হ্যামিলটনের প্রধান লক্ষ্য ছিল নবগঠিত ফেডারেল সরকারের জন্য আয়ের উৎস তৈরি করা। তখন আয়কর চালু করার মতো প্রশাসনিক সক্ষমতা ছিল না। ফলে আমদানি শুল্কই ছিল সরকারের সবচেয়ে কার্যকর আয়ের মাধ্যম। সেই সময়ের শুল্ক কিছুটা শিল্পকে সহায়তা করলেও মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজস্ব আদায়, আমদানি পুরোপুরি নিরুৎসাহিত করা নয়।
পরবর্তীকালে উনবিংশ শতকে শিল্পায়নের গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ শুল্কের দাবি জোরালো হয়। দেশীয় কারখানাগুলো বিশেষ করে ব্রিটিশ পণ্যের প্রতিযোগিতা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে চাইত। অন্যদিকে কৃষকরা তুলনামূলক কম শুল্কের পক্ষে ছিলেন, কারণ তারা আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। ফলে কৃষি ও শিল্পখাতের মধ্যে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলেছে।
১৮৯০ সালের ম্যাককিনলি ট্যারিফ ছিল সেই সুরক্ষাবাদী নীতির একটি বড় উদাহরণ। এটি আমদানি শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ালেও রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় হয়নি এবং পরবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, এই ধরনের উচ্চ শুল্ক শিল্পের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার বদলে কিছু ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত করেছিল।
১৯৩০ সালের স্মুট-হাওলি ট্যারিফ আইনকে ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত শুল্কনীতি হিসেবে ধরা হয়। শুরুতে কৃষকদের সহায়তার জন্য সীমিত পরিসরে শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকলেও পরে বিভিন্ন শিল্পখাত নিজেদের স্বার্থে আরও শুল্ক বৃদ্ধির দাবি যোগ করে। এর ফলে বহু দেশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য সংকুচিত করে এবং মহামন্দাকে আরও গভীর করে তোলে।
এরপর প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে উচ্চ শুল্ক কমিয়ে আন্তর্জাতিক মুক্তবাণিজ্যের পথে এগোয়। পরবর্তী কয়েক দশকে কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও সামগ্রিকভাবে দেশটি বৈশ্বিক বাণিজ্য সহযোগিতাকে গুরুত্ব দেয়।
২০১৬ সালে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার সময় চীনের উত্থান এবং বিশ্বায়নের প্রভাব নিয়ে অনেক আমেরিকান উদ্বিগ্ন ছিলেন। সেই অসন্তোষকে ভিত্তি করেই তিনি উচ্চ শুল্কের নীতি গ্রহণ করেন। তবে সমালোচকদের মতে, তাঁর নীতি একই সঙ্গে রাজস্ব বাড়ানো, শিল্প রক্ষা করা এবং অন্য দেশকে শুল্ক কমাতে বাধ্য করার মতো একাধিক পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করেছে।
বাস্তবে এই লক্ষ্যগুলো একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যদি উচ্চ শুল্কের কারণে আমদানি কমে যায়, তাহলে শুল্ক থেকে সরকারের আয়ও কমে। আবার যদি অন্য দেশের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে শুল্ক কমানো হয়, তাহলেও রাজস্ব হ্রাস পায়। ফলে সব লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা প্রায় অসম্ভব।
এদিকে উচ্চ শুল্ক আরোপের পরও যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থানের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি। সমালোচকদের মতে, শুধুমাত্র শুল্ক বাড়িয়ে শিল্পখাতের সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক চাপ এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে ট্রাম্পের শুল্কনীতি নানা বাধার মুখে পড়েছে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র কোন পথে এগোবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—দেশটির শুল্কনীতির দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাসকে সহজভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না, এবং সেই ইতিহাসকে নিজের নীতির পক্ষে ব্যবহার করতে গিয়ে ট্রাম্প বহু ক্ষেত্রে বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ দাবি করেছেন।
0 Comments