হাতিয়ার জাগলার চরে আধিপত্য বিরোধে গোলাগুলি, নিহত ৫, আহত অন্তত ১০

নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার জাগলার চরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ গোলাগুলির ঘটনায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও অন্তত ৮ থেকে ১০ জন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে একজনের পরিচয় নিশ্চিত করতে পেরেছে পুলিশ, তবে অপর চারজনের নাম-পরিচয় এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে হাতিয়া উপজেলার সুখচর ইউনিয়নের ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডসংলগ্ন জাগলার চর গ্রামে এ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

নিহত ব্যক্তি হলেন আলাউদ্দিন (৪০)। তিনি সুখচর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চর আমান উল্যাহ গ্রামের বাসিন্দা এবং মহিউদ্দিনের ছেলে।

হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল আলম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, একটি মরদেহ নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং ঘটনাস্থল থেকে আরও চারটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় পুলিশ বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।

তিনি আরও জানান, নিহতদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে ময়নাতদন্তের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জাগলার চরের জমি এখনো সরকারিভাবে কাউকে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়নি। এই সুযোগে গত ৫ আগস্টের পর জাহাজমারা ইউনিয়নের কোপা সামছু বাহিনী চরের বিভিন্ন জমি অবৈধভাবে বিক্রি শুরু করে। পরে সুখচর ইউনিয়নের আলাউদ্দিন বাহিনী ওই জমির দখল নিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং অধিক দামে জমি বিক্রির চেষ্টা চালায়। এতে দীর্ঘদিন ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে বিরোধ ও উত্তেজনা চলছিল।

মঙ্গলবার সকালে জমির দখলকে কেন্দ্র করে কোপা সামছু বাহিনী ও আলাউদ্দিন বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে গিয়ে গোলাগুলিতে জড়িয়ে পড়ে। এতে আলাউদ্দিনসহ মোট পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর আহত অবস্থায় আলাউদ্দিনকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। অপর চারজন ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এ সংঘর্ষে ফরিদ কমান্ডার, সামছু বাহিনীআলাউদ্দিন বাহিনীসহ তিনটি সশস্ত্র গ্রুপ জড়িত ছিল। এতে সামছু বাহিনীর প্রধান এবং আলাউদ্দিন বাহিনীর প্রধান আলাউদ্দিন নিহত হন। অভিযোগ রয়েছে, ফরিদ ডাকাত তার দলবল নিয়ে ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়ে গেছে।

এলাকাবাসী জানান, দীর্ঘদিন ধরে জাগলার চর এলাকায় সন্ত্রাস ও উশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। সংঘর্ষের সময় একাধিক বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে এবং বিভিন্ন সশস্ত্র বাহিনী চরাঞ্চল থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

ঘটনার পর জাগলার চর ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও নৌ-পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে যৌথ বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে।

এ বিষয়ে নোয়াখালী জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মোঃ আরিফ হোসেন বলেন,
“জাগলার চর এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সময় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ ও নৌ-পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন,
“এই ঘটনায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। দোষীদের শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে অভিযান চলছে। এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।”

এদিকে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের এক জনপ্রতিনিধি বলেন,
“জাগলার চরে দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য নিয়ে বিরোধ চলছিল। বিষয়টি আগেও প্রশাসনকে জানানো হয়েছিল। এই মর্মান্তিক ঘটনায় আমরা গভীরভাবে শোকাহত এবং দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তারসহ এলাকায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি জানাচ্ছি।”

ঘটনার পর পুরো জাগলার চর এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

Post a Comment

0 Comments